Wednesday, May 18, 2016

বাংলা কার দখলে, রায় আজ | জয়ন্ত চৌধুরী - বর্তমান

হয় মমতা, নয় মমতা। প্রায় দু’মাসের অপেক্ষার পর আজ, বৃহস্পতিবার বিধানসভার ভোট গণনার প্রাক্কালে রাজনৈতিক আবহের বিশ্লেষণে এই উচ্চারণই যথেষ্ট। রাজ্য বিধানসভা গঠনের এই নির্বাচনপর্বের পুরোটাই আবর্তিত হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে।
বিরোধী শিবিরের কংগ্রেস-বাম জোট, কেন্দ্রের শাসকদলের তরফে রাজ্য বিজেপির তৎপরতা থেকে শুরু করে সবপক্ষের নিশানায় এক মাত্র মমতা। এমনকী তাঁর সতীর্থদের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগের জেরে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী-রাহুল গান্ধী, সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি পর্যন্ত কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন দলনেত্রীকে। আর তাঁকেই গোটা রাজ্য চষে বেড়িয়ে ২৯৪টি আসনে একার হাতে আত্মপক্ষ সমর্থনের পাশাপাশি পালটা আক্রমণ শানাতে হয়েছে। স্বভাবতই এই নির্বাচনের ফলাফল যাঁকে ঘিরে আবর্তিত, তিনি দ্বিতীয় দফার জন্যে বাংলার মসনদে বসবেন কি না, এই প্রশ্নকে ঘিরেই টানটান উত্তেজনায় শুরু হতে চলেছে ভোট গণনা। বুথ ফেরত সমীক্ষাগুলিতে বাড়তি বল পেয়েছে শাসকদল। বিরোধী জোটনেতাদের দাবি, পাশা উলটানো এখন সময়ের অপেক্ষা। গত লোকসভা ভোটের হিসাব মাথায় রেখে পরিষদীয় শক্তিবৃদ্ধির আশায় বুক বেঁধেছে গেরুয়া শিবিরও।
জোট বনাম একক শক্তির লড়াই। প্রায় পাঁচ দশক বাদে যার সাক্ষী রইল রাজ্যবাসী। জোড়াফুল প্রতীকে বস্তুত রাজ্যের সবক’টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল তৃণমূল (তৃণমূল সমর্থিত একমাত্র নির্দল প্রার্থী হরকা বাহাদুর ছেত্রী)। পাঁচ বছর আগে কংগ্রেসকে সঙ্গে নিয়ে লড়তে হয়েছিল তৃণমূলকে। একদিকে যেমন শাসক, অন্যদিকে তেমনই প্রফুল্ল সেনের পর প্রায় পাঁচ দশক বাদে একক রাজনৈতিক দল হিসাবে নির্বাচনী পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছেন মমতা। বহুধা বিভক্ত কংগ্রেসসহ দক্ষিণপন্থী দলগুলির ঘরোয়া কোন্দলের সুবাদে সিপিএম নেতৃত্বাধীন দু’দফার যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হলেও রাজ্য রাজনীতিতে ১৯৭৭ সালে জ্যেতি বসুর বামফ্রন্ট সরকারের পত্তনের পর থেকে ডান-বাম মেরুকরণ স্পষ্ট হয়েছিল। সেই মেরুকরণকে কাজে লাগাতে এক দশক অপেক্ষা করতে হয়েছে মমতাকে। ২০০১ সালে ‘হয় এবার, নয় নেভার’ থেকে রাজ্যে পট ‘পরিবর্তন’করতে কংগ্রেসের হাত ধরতে হয়েছিল তাঁকে। 
মুখ্যমন্ত্রীর কুরশিতে বসার প্রথমবারের মেয়াদ শেষে সেই কংগ্রেস তাঁর বিরোধী শিবিরে। শুধু তাই নয়, সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর বামফ্রন্টের সঙ্গে জোট বেঁধে ভোটের ময়দানে। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে মোদি হাওয়ায় ভর করে তৃণমূল বিরোধী ভোটে থাবা বসায় বিজেপি। একলাফে প্রায় ১১ শতাংশ ভোট বেড়ে যায় তাদের। ফলে প্রায় সাড়ে তিন দশকের মেরুকরণে ভাঙন ধরায় গেরুয়া বাহিনী। যার মাশুল দিতে হয়েছে বাম ও কংগ্রেসকে। এবারের বিধানসভা নির্বাচনেও এই দ্বিধাবিভক্ত বিরোধী শিবিরই ভরসা জোগান দিচ্ছে তৃণমূলকে। শাসকদলের নেতারা যেমন সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে বিজেপি কতটা ভোট কাটতে পারে, তার হিসাবে মশগুল। ঠিক উলটো দিকে এই বিজেপি আতঙ্ক তাড়া করে বেড়িয়েছে বাম ও কংগ্রেস নেতাদের। জোটনেতাদের ব্যাখ্যা, লোকসভা ভোটে তৃণমূল বিরোধী যে ভোট পদ্মফুলে চলে গিয়েছিল, তার সিংহভাগই বাম ভোটের অংশ। এই বিধানসভা নির্বাচনে তা ফিরে আসবে জোটের ঝুলিতে। তার সঙ্গে কংগ্রেসের কমবেশি ১০ শতাংশ ভোট (মুলত তিন জেলাতে সীমাবদ্ধ) এবং সারদা থেকে হালের নারদ ঘুষ-কাণ্ডে জনমানসে তৈরি হওয়া বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরিবর্তনের পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হবে। 
কিন্তু জোটনেতাদের এই পরিকল্পনায় বাদ সেধেছে এই রাজ্যকে ঘিরে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহদের গেমপ্ল্যানে। রাজ্যে সংগঠনের খরা কাটাতে এবার কেন্দ্রীয় শাসকদল যতটা সক্রিয় উদ্যোগ নিয়েছিল, তা অতীতে দেখা যায়নি। শুধু মাত্র প্রধানমন্ত্রী গোটা রাজ্যে চার দফায় মোট ১১টি জনসভা করেছেন। কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন মমতাকে। এই আক্রমণ যতই তীব্র হয়েছে, ততই স্বস্তি ফিরেছে তৃণমূলে। বিশেষত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আস্থা অটুট রাখতে সহায়ক হয়েছে মোদির মমতা বিরোধী কড়া ভাষণ। আর তাতেই রাজ্যের শাসক দলবিরোধী ভোট বিভাজনের আশঙ্কা ক্রমে গ্রাস করেছে বাম-কংগ্রেস নেতাদের। অধীর চৌধুরি থেকে সূর্যকান্ত মিশ্র— সবার গলাতেই ছিল ‘মোদিভাই-দিদিভাই’ নীরব বোঝাপড়ার তত্ত্ব। 
রাজনৈতিক মহলের মতে, একদিকে মমতার গত চার বছরের বহুবিধ উন্নয়নমূলক প্রকল্প, আর্থিক সহায়তা, সস্তায় চাল, কন্যাশ্রী থেকে পড়ুয়াদের সাইকেল ইত্যাদি বিতরণে বৃহত্তর গ্রামীণ সমাজে যে জনভিত্তি তৈরি হয়েছে, তার উপরেই ভরসা করে রাজ্যে প্রত্যাবর্তনের লড়াইতে নেমেছিলেন মমতা। এরই সঙ্গে রাজনৈতিক মেরুকরণ ভেঙে গিয়ে তৃতীয় শক্তি হিসাবে হিন্দুত্ববাদীদের উত্থান পরোক্ষে মমতার পালে হাওয়া দিয়েছিল। এই ভোটে বিজেপির প্রাপ্ত ভোটই তৃণমূল ও জোটের ব্যবধান গড়ে দেবে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা। শুধুমাত্র দলের একাধিক নেতা-মন্ত্রীর নাম সারদা ও নারদ কেলেঙ্কারির জেরে জড়িয়ে যাওয়ায় তাঁর লড়াইটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মমতা মনে করেন সবটাই তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। তাই তিনি দিনভর ভোট গণনার প্রস্তুতি নিয়ে সব জেলা নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শেষ মুহূর্তের নির্দেশ দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, অন্তর্ঘাতমূলক কাজের আশঙ্কা রয়েছে। তাই গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ যেন গণনা কেন্দ্র ছেড়ে না বেড়িয়ে আসেন, সে বিষয়ে দলের নেতাদের সতর্ক করে দিয়েছেন মমতা। গণনা নিয়ে দলের এজেন্টদের সজাগ রাখার পাশাপাশি রাজ্যে ৯০টি কেন্দ্রেই কমিশন নির্দিষ্ট ১০০ মিটারের সীমানার বাইরে দলীয় জমায়েতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বামফ্রন্ট।

No comments:

Post a Comment