Wednesday, May 18, 2016

১৯ মে প্রশ্ন একটাই, মমতাই থাকবেন, নাকি সিপিএম পার্টিটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে? | হিমাংশু সিংহ - বর্তমান

এক্সিট পোল মমতার জয়ের পূর্বাভাস দিলেও জোট রাজনীতির কারবারিরা এখনও বাজি ছাড়তে রাজি নন। তাঁদের অপেক্ষা ১৯ মে’র আসল ফলের জন্য। নিশ্চিতভাবে আমাদেরও সেই ফল বেরনো পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে। দিল্লি ও বিহার বিধানসভার মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও কোনও এক্সিট পোলই মিলবে না, বরং প্রকৃত ফল উলটো হবে বলেই বিরোধীদের দাবি।
আসলে গত দু’মাস ধরে জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে শতাব্দীর সবচেয়ে অত্যাচারী, নৃশংস শাসক সাজিয়ে এমন কদর্য একতরফা প্রচারের পরও যদি জোট কেল্লা ফতে করতে ব্যর্থ হয় তাহলে এরাজ্যে সিপিএম ও কংগ্রেসের রাঘব বোয়ালরা যে ক্রমেই আরও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে, তা বলাই বাহুল্য। সেই আতঙ্ক থেকেই ‘মরার আগে মরতে’ রাজি নন বাম নেতারা। কারণ, এত করেও, সব ফ্রণ্ট খুলে দিয়ে সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করেও মমতাকে খতম করা না গেলে বুঝতে হবে প্রতিপক্ষ সূর্যকান্ত, অধীর, মানস ভুঁইঞার সঙ্গে তৃণমূলনেত্রীর কোনও তুলনাই চলে না। যদিও জোটের অন্যতম কান্ডারি বিমান বসুই সর্বপ্রথম অন্যরকম কিছু গন্ধ পেয়ে জোটের জয় নিয়ে ঢোক গিলেছেন। সম্ভবত নীচের তলার কমরেডদের চার্জ করতে তাঁর দলেরই এক শ্রেণির নেতার ক্রমাগত মিথ্যাচারণা আর স্টেরয়েড খাওয়ানো কথাবার্তা তিনিও আর সহ্য করতে না পেরেই এমনটা করেছেন। তাই সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন ছুড়েছেন, জোট ২০০ পাবে তো? তখন অলিমুদ্দিনের সবচেয়ে সৎ আর পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির বিমান বসু বিরক্ত মুখে জানিয়ে দিয়েছেন, যে বলেছেন তাঁকেই জিজ্ঞাসা করুন না! বিমানবাবু বরাবরই সোজা সাপটা। অন্য বাম নেতাদের মতো তাঁর অনেকগুলো মুখ নেই। নানারকম ধান্দা নেই। পার্টির মধ্যে কোটারি তৈরির দায় নেই। বামপন্থী কূট কৌশল আর নানারকম স্কিম করে কখনও সোজা কখনও উলটো লুডোর ছকে এগনো তাঁর রক্তে নেই। তাই বাড়িয়ে অতিরঞ্জিত করে বলার কোনও দায়ও তাঁর নেই। তবে সূর্যকান্ত মিশ্ররাও কিন্তু ইতিমধ্যেই ‘হাইপ’ কমিয়ে কিছুটা সুর নরম করার দিকে এগচ্ছেন। ২০০ আসন জেতা নিয়ে তাই ভোটের পর তাঁর মুখে আর তেমন কোনও রোমাঞ্চকর মন্তব্যও শোনা যাচ্ছে না। উলটে ১৯ মে ফল ঘোষণার পর জয় এলে ঠিক আছে কিন্তু মমতা নিশ্চিতভাবে ফিরলে প্রত্যন্ত গ্রামেগঞ্জে দলের ক্যাডারদের সন্ত্রাসের হাত থেকে বাঁচানোই যে এখন প্রধান লক্ষ্য তা নিয়ে ঠারেঠোরে ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছে আলিমুদ্দিনের কর্তারা। আর পার্ক সার্কাসের খোলা ময়দানে অসুস্থ শরীরেও দেশের সবচেয়ে বড় বড় দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত নেহরু-গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকারীর সঙ্গে একই মালায় বাঁধা-পড়া বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তার পর থেকেই আর প্রকাশ্যে কোনও বক্তব্য রাখেননি। যেন ওটাই ছিল পশ্চিমবঙ্গকে বাঁচাতে, এরাজ্যের মরা গাঙে বান আনতে এই শতাব্দীর সেরা উদ্যোগ (নাকি ইতিহাস বলবে প্রকাণ্ড বামপন্থী ধাপ্পা)! তার পর আর কিছু দরকার নেই। রাহুল গান্ধীকে মালা পরালেই কেল্লা ফতে! তার পর আর সব শূন্য! পার্ক সার্কাসের পর তাই দাম্ভিক নেতার পরের ডেস্টিনেশন জন্মদিনে মৃণাল সেনের বাড়ি। ভাগ্যিস সত্যজিতবাবু এখনও বেঁচে নেই!
সে যাই হোক, গত দু’মাসে সিপিএম ও তার লেজুড় অন্য বামপন্থী দলগুলি নিজেদের কাজের মধ্যে দিয়ে প্রমাণ করেছে যেন তেন প্রকারে ক্ষমতায় বসাই আজকের বামপন্থী দলগুলির একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এবং, কোনও নীতি আদর্শ সততার বড়াই নয় সার্বিকভাবেই মমতা নামক এক প্রবল ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে তাঁর সঙ্গে মুখোমুখি ব্যক্তিগত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়ে বামপন্থীরা কি নিজেদের ইতিহাসকেই আর একটু কলঙ্কিত করলেন না? নাকি টানা ৩৪ বছর ক্ষমতার চিটেগুড়ে আটকে থাকতে থাকতে আর তর সইছে না। তাই গদিতে ফিরতে যাবতীয় আদর্শ, ইতিহাস ও অতীত বিশ্বাসকেও বাস্তবের মাটিতে বলি দিতে, বিসর্জন দিতে তাই তাঁরা আজ আর কোনওমতেই পিছপা হননি। সেজন্য যদি ‘গলি গলি মে শোর হ্যায়, রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়’ ভুলে গিয়ে সেই পরিবারেরই আজকের কান্ডারি রাহুল গান্ধীর সঙ্গে একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে সাড়ে ছ’ঘণ্টার বাসি মালায় বাধা পড়তেও রক্তকরবীর রাজার আজ কুছ পরোয়া নেহি! মমতার ভয়ে বাঘে গোরুতে একঘাটে জল খাওয়ার এই ছবিই এবারের ভোটের সবচেয়ে বড় পাওনা। নিঃসন্দেহে ইতিহাসেরও উজ্জ্বল রসদ।
কংগ্রেসের সঙ্গে সিপিএমের অর্ধশতাব্দীরও বেশি হিমশীতল সম্পর্ক, ’৭২ থেকে ’৭৭-এর কালা জমানাকে ফিরতে না-দেওয়ার শপথ, বোফর্স কেলেঙ্কারির সেই আগুনে দিনগুলিতে কংগ্রেস-বিরোধী আন্দোলন, মিছিল, স্লোগান কিংবা চারবছর তিনমাস প্রায় একখাটে সহবাস করার পরও পরমাণু চুক্তির মতো ঠুনকো ইস্যুতে বিচ্ছেদ। আবার সব ভুলে এরাজ্যে দোস্তি আর দক্ষিণে কেরলে সস্তা কুস্তি, সিপিএমের সুযোগসন্ধানী ক্ষমতা দখল সর্বস্ব রাজনীতিরই নামান্তর। গত দু’মাসে সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বামপন্থীরা মিডিয়ার একাংশের তামাক খেয়ে মমতাকে যেভাবে হিটলারের চেয়েও ভয়ঙ্কর এক মারণ দৈত্য সাজাতে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন তাও এক কথায় রাজ্য রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত। এমনও বলা হয়েছে বা সুকৌশলে এমন একটা ধারণা তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে যে, ৩৪ বছরের বাম আমলে এরাজ্যে সবকিছু ঠিক ছিল। নিটোল গণতন্ত্রের এক অনাবিল ছবি সারা রাজ্যে ছড়িয়ে ছিল। যেন সেই জ্যোতিবাবুর আমল থেকেই হুড়মুড়িয়ে একের পর এক বড় মাপের শিল্প আসছিল, কৃষির উৎপাদন সর্বভারতীয় রেকর্ডকে ছাপিয়ে যাচ্ছিল। চাকরি তথা কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে এরাজ্য থেকে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ভিন রাজ্যে যাওয়া জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আশ্চর্য কর্মতৎপরতায় রুখে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। ফি বছর গ্রীষ্মে লন্ডনে গিয়ে ব্যাগ ভরতি করে শিল্পও কম আনেননি সেসময়ের অবিসংবাদী বঙ্গেশ্বর। গোটা রাজ্যটাকে বামেরা এককথায় কমপিউটারের, শিল্পের উন্নয়নের মৃগয়া ক্ষেত্র করে সোনায় ভরিয়ে তুলেছিল! যেন একটা কারখানাও ট্রেড ইউনিয়নের বাড়াবাড়িতে ওদের আমলে বন্ধ হয়নি। গোঘাট খানাকুল গড়বেতায় কোনও বিরোধী নেতার বাড়ি আক্রান্ত হয়নি। রাজ্যজুড়ে শুধু হাতিশালে হাতি আর ক্যাডারশালে ক্যাডার! দুঃশাসনেরা যেন ছিল সর্বক্ষেত্রে ব্রাত্য! বামপন্থীদের যত্নে তৈরি করা এমনই এক সোনার বাংলাকে মাত্র পাঁচ বছরে ছারখার করে শ্মশান করে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল। গল্পের নয়, প্রচারের গোরুকে গাছে তুলতে বামপন্থীরা এও বলতে শুরু করলেন, পাঁচ বছরে যা ক্ষতি হয়েছে তা ৩৪ কেন ৩৪০ বছরেও বামপন্থীরা তা করতে পারতেন না। এমন একটা প্রচার হয়েছে, যে সিপিএমের ৩৪ বছরে এই বাংলায় একটাও ফলস ভোট পড়েনি, কোথাও কোনও সন্ত্রাস হয়নি, বিরোধীরা মার খায়নি, এলাকা ছাড়া হয়নি। কখনও কোনওদিন স্বপ্নেও একটাও বুথ দখল হয়নি, একজন নেতাও জনগণের টাকায় ঝুপড়ি ঘর থেকে কোটি টাকার অট্টালিকায় সুখনিদ্রা যাননি। এসবই আসলে গোয়েবলসের ধাঁচে বামপন্থীদের পুরানো খেলা। কিন্তু, ব্র্যান্ড বুদ্ধের বাড়াবাড়ির মতো এবারও সিপিএম নেতারা স্টেরয়েডটা বোধহয় একটু বেশিই দিয়ে ফেলেছেন। আর তাই ১৯ মে’র বাস্তবের মাটিতে যখন মমতা মিথের সামনে আরও একবার তাঁদের বেলুনটা চুপসে যাবে (নাকি গ্যাস বেলুনের মতো সুতো ছিঁড়ে উড়ে যাবে!) তখন নীচের তলার কমরেডদের কী হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন আলিমুদ্দিনের কর্তারা। আবার এত কিছুর পরেও রিগিং সন্ত্রাসের ফাটা রেকর্ড বাজালে মানুষ গ্রহণ করবে কি না সেই ভয়ও আছে ষোলো আনা। সিপিএম নেতারাও আড়ালে আবডালে স্বীকার করেন, প্রয়াত অনিল বিশ্বাসের কারিকুরি না থাকলে ২০০১ সালেই ক্ষমতাচ্যুত হতে হত বামপন্থীদের। সেবার সব দিক দিয়ে সিপিএম ও তার বশংবদ শরিকদের প্রায় পেড়ে ফেলেছিলেন সেদিনের অগ্নিকন্যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘এবার নয় তো নেভার’ সেই নির্বাচনের শেষে ফল বেরলে দেখা যায় কংগ্রেসকে ট্যাকে গুঁজেও মমতা ৮৬ আসনে থেমে গিয়েছেন। আর সিপিএম তথা বামপন্থীরা পান ১৯৯ আসন। ভোট গণনার দিন দুপুর পর্যন্ত আলিমুদ্দিন ছিল শুনশান। দুপুরে জয়ের ছবিটা স্পষ্ট হতেই বাম নেতারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। এসব দেখেও অবশ্য সেদিন কোনও বিদগ্ধ মিত্র-মশাই হামাগুড়ি দিয়েও বামেদের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার শপথ নেননি। তার পর ২০০৬ সালে ব্র্যান্ড বুদ্ধের দামামা বাজানো মিডিয়া হাইপের কল্যাণে (না, বলা ভালো—অভিশাপে) সেই বামেরাই পায় ২৩৫ আসন। যে ২৩৫-এর দম্ভই উন্নাসিক অহংকারী বুদ্ধদেবকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে শিল্পস্থাপনের নামে বুলডোজার চালাতে প্ররোচিত করে। আর সেখান থেকে শুরু হয় বাম জমানার ঐতিহাসিক পতন। 
২০১১ সালে কং-তৃণমূল জোট যেখানে ২২৬ আসন জিতে এরাজ্য থেকে সাড়ে তিন দশকের জগদ্দল বাম শাসনকে উপড়ে ফেলতে সমর্থ হয়। আর আজ ২০১৬-এর বিধানসভা ভোটের ফল ঘোষণা ৪৮ ঘণ্টা আগে সারা রাজ্য যখন উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে। মোবাইল থেকে মোবাইল ছুটছে ভোটের আজগুবি ফলাফল। এবছর প্রচারে ও মিছিল পদযাত্রায় মমতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কম করে ৮০-৮৫ কিলোমিটার হাঁটা বিমান বসু কিন্তু ইতিমধ্যেই ঢোক গিলতে শুরু করেছেন। আর এখানেই ধন্দের শুরু। এমনিতে ভোট যখন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় হয়েছে, বুথে যখন একটা মাছিও গলতে পারেনি তখন ফলাফল যাই হোক সবাইকে মেনে নিতে হবে। কোনও মরাকান্না কাঁদলে চলবে না। বিমানবাবু বরাবরই তোল্লার রাজনীতি পছন্দ করেন না। ব্র্যান্ড বুদ্ধের সময়ও ওই আহ্লাদেপনা আগাগোড়া তাঁর ছিল না-পসন্দ। আর আজকে ফের এক শ্রেণির প্রচার মাধ্যমের তোল্লাই গল্পের গোরুকে গাছে তুলে জোটের ২০০ আসন জেতার খোয়াব তাই তিনি মন থেকে মানতে পারছেন না। গোটা রাজ্যের রাজনীতি সচেতন মানুষই তাই ১৯ মে’র আসল ফলের প্রহর গুনছেন। সেদিন সূর্য যখন মধ্যগগন থেকে ক্রমে পশ্চিমে ঢলে পড়বে তখনই লেখা হয়ে যাবে রাজ্যের আগামী পাঁচ বছরের ভবিষ্যৎ। সহস্রাধিক হায়নার আক্রমণ ঠেকিয়ে মমতা যদি ফেরেন তাহলে বাঙালির আর একটা মিথও ভেঙে যাবে। শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব হিসাবে মেনে নিতে কি তবুও বিদগ্ধ বাঙালির অসুবিধা হবে?

No comments:

Post a Comment